থ্যালাসেমিয়া রোগ সম্পর্কে
মেডিক্যাল স্টুডেন্টদের জন্য
বাংলায় লিখলাম। উদ্দেশ্য
তারা যেন সাধারন মানুষকে
সহজে রোগটি সম্পর্কে
বোঝাতে পারেন।
থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে যে
কেউ লেখাটি ব্যবহার করতে
পারেন।
থ্যালাসেমিয়া (রক্তরোগ)- এক
নীরব মহামারী
প্রত্যক বাবা মা-ই চায় তাদের
সন্তান সুস্থ্য সুন্দর ভাবে জন্ম
লাভ করুক। কিন্তু কারো কারো এ
স্বপ্ন ভেঙ্গে যায় জানা অজানা
নানা কারনে। থ্যালাসেমিয়া
তেমনি একটি জন্মগত রক্তরোগ
যাতে বাবা-মার স্বপ্ন ভেঙ্গে
যায়। যে সব সমাজে আত্মীয়
স্বজনের মধ্যে বিয়ে শাদী
বেশী প্রচলিত সে সব সমাজে
থ্যালাসেমিয়ার মতো বংশগত
রোগ বালাই বেশী। বাবা-মা এ
রোগের বাহক হলে তাদের
সন্তান থ্যালাসেমিয়া রোগ
নিয়ে জন্মাতে পারে। যারা
থ্যালাসিমিয়া রোগের বাহক
তাদের কোন উপসর্গ নেই। এরা
স্বাভাবিক জীবনযাপন করে।
দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায়
দশভাগ অর্থাৎ প্রায় দেড় কোটি
পুরুষ-মহিলা নিজের অজান্তে
থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক।
আমাদের দেশে প্রতিবছর
হাজার হাজার শিশু
থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে
জন্মায়। কিন্তু জন্মের পর পরই এ
রোগটি ধরা পড়েনা। শিশুর বয়স
এক বছরের বেশী হলে বাবা মা
লক্ষ্য করেন শিশুটি ফ্যাকাসে
হয়ে যাচ্ছে, বাড়ছে শিশুর
দূর্বলতা। আর তখনই শিশু
বিশেষজ্ঞ রক্ত পরীক্ষা করে
শিশুটিকে থ্যালাসেমিয়ায়
আক্রান্ত শিশু হিসাবে চিহ্নিত
করেন, বাবা-মায়ের মাথায়
আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। বাবা-মা
জানতে পারেন যে তারা দুজনেই
থ্যালসেমিয়া রোগের বাহক।
আমাদের দেশে থ্যালাসেমিয়া
এখন এক নীরব মহামারী যাতে
প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর
মৃত্যু হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে বাবা-
মায়ের স্বপ্ন।
থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুর
কি সমস্যা হয়?
থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত
শিশুদের শরীরে রক্তের মূল্যবান
উপাদান হিমোগ্লোবিন
ঠিকমতো তৈরী হয়না। শিশুর বয়স
এক বা দুই বছর হলে শিশুর রক্ত
শূন্যতা দেখা দেয় এবং
ফ্যাকাশে হয়ে পড়ে। শিশুর
স্বাভাবিক দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত
হয়, শরীর দূর্বল হয়ে পড়ে। ধীরে
ধীরে শরীরের দরকারী অঙ্গ
যেমন প্লীহা, যকৃৎ বড় হয়ে যায়
এবং কার্যক্ষমতা হারাতে
থাকে। মুখমন্ডলের হাড়ের
অস্থিমজ্জা বিকৃত হওয়ার
কারনে শিশুর চেহারা বিশেষ রুপ
ধারন করে যা দেখে চিকিৎসক
সহজেই থ্যালাসেমিয়ায়
আক্রান্ত শিশুকে চিহ্নিত করতে
পারেন। থ্যালাসেমিয়ায়
আক্রান্ত শিশুদেরকে অন্যের
রক্ত নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়।
অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন
থ্যালাসেমিয়া রোগের
একমাত্র চিকিৎসা যা অত্যন্ত
ব্যয়বহুল ও সব সময় সফল নয়।
কেউ থ্যালাসেমিয়া রোগের
বাহক কিনা তা কিভাবে জানা
যায়?
থ্যালাসেমিয়া রোগের
বাহকদের কোন লক্ষন থাকেনা।
তারা স্বাভাবিক জীবন যাপন
করে। তাদের শরীরে রক্তের
হিমোগ্লোবিনের মাত্রা
সামান্য কম থাকে। তাদেরকে
সাধারনত রক্ত গ্রহন করতে হয়না।
তবে একজন থ্যালাসেমিয়া
রোগের বাহক নারী গর্ভবতী
হলে রক্তের হিমোগ্লোবিন
বেশী কমে যেতে পারে যে
কারনে কারো কারো
গর্ভাবস্থায় দুই/এক ব্যাগ রক্ত
গ্রহনের প্রয়োজন হতে পারে। যে
কোন মানুষের রক্তের সিবিসি
(CBC) পরীক্ষা করে সন্দেহ করা
যায় যে সে থ্যালাসেমিয়া
রোগের বাহক কিনা। এই
পরীক্ষায় সন্দেহ হলে তখন
হিমোগ্লোবিন
ইলেকট্রোফোরেসিস (Hb
Electrophoresis
) নামের আর একটি পরীক্ষার
মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় সে
ব্যক্তি থ্যালাসেমিয়া রোগের
বাহক কিনা। সিবিসি পরীক্ষা
করতে ১০০-১৫০ টাকা, আর
হিমোগ্লোবিন
ইলেকট্রোফোরেসিস পরীক্ষা
করতে ৫০০-৭০০ টাকা লাগে।
যদি স্বামী-স্ত্রী দুজনেই
থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হয়
তাহলে সুস্থ্য বাচ্চা পাওয়ার
উপায় কি?
স্বামী এবং স্ত্রী দুজনই যদি
থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হন
তবে শতকরা ২৫ ভাগ ক্ষেত্রে
তাদের সন্তান থ্যালাসেমিয়া
রোগ নিয়ে, ৫০ ভাগ বাহক
হিসেবে এবং ২৫ ভাগ সুস্থ্য শিশু
হিসেবে জন্ম নিতে পারে। তাই
সন্তান গ্রহনের ক্ষেত্রে
মাতৃজঠরে বাচ্চার ডিএনএ
টেস্টের মাধ্যমে বাচ্চার
থ্যালাসেমিয়া রোগ নির্নয়
তাদের একমাত্র ভরসা। মায়ের
গর্ভে বাচ্চার বয়স যখন ১১ হতে
১৫ সপ্তাহ তখন প্রাথমিক গর্ভফুল
হতে কোষকলা সংগ্রহ (Chorionic
Villus Sampling) বা গর্ভের বাচ্চার
চারপাশের পানি সংগহের
(Amniocentesis) মাধ্যমে বাচ্চার
ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়। আর এই
ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করে
গর্ভের বাচ্চার থ্যালাসেমিয়া
রোগ আছে কিনা তা শতভাগ
নিশ্চিত হওয়া যায় । এ সময়
বাচ্চার আকার থাকে দেড় হতে
দুই ইঞ্চির মতো। কাজেই সুস্থ
বাচ্চা পাওয়া না পাওয়া
সম্পর্কে নিশ্চিৎ হয়ে বাবা-মা
গর্ভাবস্থা চালিয়ে যাওয়ার
ব্যপারে সিদ্ধান্ত নিতে
পারেন। মাতৃজঠরে ভ্রুনের
ডিএনএ পরীক্ষা করে
থ্যালাসেমিয়া নির্নয় এখন
দেশেই হচ্ছে যা আমাদের
চিকিৎসা ব্যবস্থায় মাইল ফলক।
গর্ভবতী মাকে এজন্য আর বিদেশ
যেতে হচ্ছেনা।
প্রতিরোধের উপায়ঃ
একটু সচেতন হলেই আমরা এ রোগ
প্রতিরোধ করতে পারি। বিয়ের
আগে পাত্র-পাত্রী বা বাচ্চা
নেয়ার আগে স্বামী-স্ত্রী
থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক
কিনা আছে তা পরীক্ষা করে
দেখতে হবে। পৃথিবীর অনেক
দেশে যেমন, সাইপ্রাস ১৯৭৩
সালে, বাহরাইন ১৯৮৫, ইরান
২০০৪, সৌদি আরব ২০০৪, এবং
সর্বশেষ পাকিস্তান ২০১৩ সালে
বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর বা
বাচ্চা নেয়ার আগে স্বামী-
স্ত্রীর থ্যালাসেমিয়া আছে কি
না তা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক
করে থ্যালাসেমিয়া রোগকে
নিয়ন্ত্রন করা গেছে। যে কেউ
থ্যালাসিমিয়া রোগের বাহক
হতে পারে। রক্ত পরীক্ষার
মাধ্যমে সহজেই জানা যায় কেউ
থ্যালাসেমিয়া বাহক কিনা।
বাবা এবং মা দুজনেই
থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক
হলেই কেবল সন্তানের
থ্যালাসেমিয়া রোগ হওয়ার
সম্ভাবনা থাকে। একজন বাহক
এবং অপরজন সুস্থ এমন দুজনের
মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হলে
সন্তানদের কোন সমস্যা হবেনা।
রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে
থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত
শিশুদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে
বিশাল রক্তের ভান্ডার
প্রয়োজন হচ্ছে। আনুসাঙ্গিক খরচ
বহন করতে গিয়ে আর্থিক
দৈন্যতা ও মানসিক যন্ত্রনায়
ভুগছে লাখো বাবা-মা। শুধু তাই
নয়, বাবা মায়ের সামনেই ১০
থেকে ১৫ বছর বয়সের মধ্যে
বেশীরভাগ থ্যালাসেমিয়ায়
আক্রান্ত শিশুর জীবন প্রদীপ
নিভে যাচ্ছে। আমাদের দেশে
থ্যালাসেমিয়া এখন এক নিরব
মহামারী যাতে প্রতিবছর
হাজার হাজার শিশুর মৃত্য হচ্ছে।
ধংস হচ্ছে বাবা-মায়ের স্বপ্ন।
সাধারন মানুষের মধ্যে
সচেতনতা তৈরী করার জন্য ৮ মে
সারা পৃথিবীব্যপী বিশ্ব
থ্যালাসেমিয়া দিবস পালন করা
হয়। কিন্তু "অজ্ঞাত কারনে"
জাতীয় জীবনে তেমন গুরুত্ব নেই
এমন দিবস বেশ ঘটা করে পালন
করলেও থ্যালাসেমিয়া দিবস
পালনে আমাদের এতদিন কোন
আগ্রহ ছিলনা। অথচ শিশু মৃত্যুর
হার কমানো আমাদের লক্ষ্য।
থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসার
কথা যতটা বলা হয়, প্রতিরোধের
কথা তেমন বলা হয় না।
আশার কথা, বর্তমান ডিজি
হেলথ্ মহোদয় থ্যালাসেমিয়া
প্রতিরোধে এক যুগান্তকারী
পদক্ষেপ নিয়েছেন। ফেসবুকে
থ্যালাসেমিয়ার ভয়াবহতা
নিয়ে আমাদের বিভিন্ন লেখা
তার দৃষ্টি আকর্ষন করে। তিনি
কথা দিয়েছেন, কথা রেখেছেন।
থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে
ইতিমধ্যে একটি কমিটি হয়েছে।
ডা: মারুফুর রহমান অপু
সেই
কমিটির সদস্য সচিব হিসাবে
কাজ করছেন। সবার অংশ গ্রহনে
থ্যালাসেমিয়ার স্থান হবে
ইতিহাসের পাতায়।
থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা
মানে অন্যের রক্ত নিতে নিতে
অকাল মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেয়া।
দৈনন্দিন জীবনে আমরা ভালো
থাকার জন্য কত না পরিকল্পনা
করি। আসুন সুস্থ্য সন্তানের বাবা
মা হওয়ার জন্য, মেধাদীপ্ত দেশ
গড়ার জন্য, থ্যালাসেমিয়া রোগ
সম্পর্কে সচেতন হই। মৃত্যু
পরোয়ানা নিয়ে শিশুর জন্ম
প্রতিরোধ করি।
.
- ডা. রেজাউল করিম কাজল
সহযোগী অধ্যাপক,
প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ
,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল
বিশ্ববিদ্যালয়
বত্রিশ তম ব্যাচ, রাজশাহী
মেডিক্যাল কলেজ
No comments:
Post a Comment